Wellcome to National Portal
মেনু নির্বাচন করুন

খাজুরার খাজুরের গুড়

যশোর নামটির সাথে খেজুরের গুড় এমনভাবেই মিশে গেছে যে, আত্বীয়-স্বজনরা ফরমায়েশ করতো " ছুটিতে বাড়ী এলে খেজুরের গুড় এনো" শীতের আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। শীতের খাদ্য তালিকায় আকর্ষনীয় বিষয় খেজুরের রস,গুড় আর পিঠা-পায়েস। খেজুর সারাদেশে উৎপাদন হলেও যশোরের ব্যাপার ভিন্ন। কারন এই অঞ্চলের যে পথেই আপনে যান, দেখবেন সারি সারি খেজুরের গাছ।এমনকি বিস্তৃত ধানক্ষেতের আইল দিয়েও খেজুরের গাছ। অবিভক্ত ভারতে যশোর জেলা খেজুরের গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। এ জন্য একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, যশোরের যশ, খেজুরের রস।

 

সময়ের সাথে সাথে সঙ্গে যশোরে কলকারখানায় উন্নত হলেও পরিবর্তন হয়নি খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড়-পাটালি তৈরির দেশীয় পদ্ধতির। শীত শুরুর আগে আগেই গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজে বের হয়ে পড়ে। খেজুর গাছ কেটে পরিষ্কার করে শুরু করে রস সংগ্রহ। আমরা জানি মাটির কলসীতে সারারাত রস জমে। ভোরের আলো বের হওয়ার সাথে সাথে গাছিরা রস ভর্তি মাটির ভাঁড় নামিয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করে। পরে এই রস টিনের ট্রের মত পাত্রে জ্বাল দিয়ে ঘন করে এই গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখা হয়। গুড় জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করে। কখনও কখনও এর সাথে নারিকেল মিশিয়ে ভিন্ন স্বাদ দেয়া হয়। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে খেজুরের রস থেকে গুড় ও গুড় থেকে বাদামি চিনি তৈরির ব্যাবসা শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের ধোবা নামক স্থানে ইংরেজ ব্ল্যাক সাহেব প্রথম কুঠি স্থাপন করে চিনি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষতির মুখে তিনি কোম্পানি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। প্রায় একই সময় কলকাতার গ্লাডস্টোন উইলি অ্যান্ড কোং যশোরের চৌগাছায় এসে কারখানা স্থাপন করে। এরা এলাকার চাষীদের কাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও চিনি তৈরি করতো যা পরবর্তিতে যশোরের কোটচাঁদপুর, কেশবপুর, ত্রিমোহিনী, ঝিকরগাছা ও নারিকেলবাড়িয়ায় এই কোম্পানির কারখানা গড়ে ওঠে।

 

১৮৬১ সালে নিউহাউস সাহেব ভৈরব ও কপোতাক্ষের সঙ্গমস্থল চৌগাছার তাহিরপুরে একটি চিনির কল স্থাপন করে ইউরোপীয় কায়দায় চিনি ও মদ প্রস্তুত শুরু করেন। যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, কোটচাঁদপুরের আশেপাশে প্রায় পাঁচশ' চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুরের গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের অন্যান্য ব্যবসায়ের সাথে চিনি রপ্তানির ব্যবসায়ে নামে। আজ কোটচাঁদপু্রে সেই অঞ্চলে দুইটি বড় চিনিকল-মোবারকগঞ্জ চিনি কল আর কেরু চিনি কল। কাচামাল হিসেবে এখন আখ ব্যাবহার করা হয়। খেজুর চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে খেজুর গুড়-পাটালির সমাদর কমেনি। যশোর জেলা গেজেটিয়ার থেকে জানা যায়, ১৯৭০-৭১ সালে এ জেলায় (বৃহত্তর যশোর—যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল ও মাগুরা) খেজুর চাষের আওতায় জমির মোট পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১৫৫ একর। এর মধ্যে ৮ হাজার ৮৫৫ একর জমির খেজুর গাছ থেকে রস পাওয়া যেত। সে সময় একরপ্রতি সাড়ে ২২ টন হিসেবে বার্ষিক রসের উত্পাদন ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার জরিপ রিপোর্টে বৃহত্তর যশোর জেলায় ৭ হাজার ১৯৩টি গুড় তৈরির কারখানা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অবশ্য এসব কারখানার সবই গৃহভিত্তিক। যশোর ছাড়াও ঝিনাইদহ, চুয়াডাংগা,মাগুরা, নড়াইল, খুলনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, মাদারীপুরে গুড়-পাটালি তৈরি হয়।

 

এছাড়া যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার  খাজুবা নামক স্থানে খেজুর গাছের আধিক্য তাকার কারনে এখানকার একটি এলাকার নাম করন করা হয়েছে খাজুরা।খেজুর গাছ কাঁটা নিয়ে এ অঞ্চলে াকেটি আঞ্চলিক গান প্রচলিত আছে-

ঠিলে ধুয়ে দেরে বউ গাছ কাঁটতি যাব

সন্ধ্যের রস ঝাড়ে আনে জাউ রান্দে খাবো।


Share with :

Facebook Twitter